Thursday, October 23, 2008

নষ্ট সময়ে বোদলেয়ার

আমার হাত ধরে সবুজ ক্যালেন্ডার আর
তুমি ব্যাটা ঘড়ির রেডিয়াম ডায়াল
ঘামতে ঘামতে বেশ দারুণ পাল্টে গেলে
দেখছো তো, এরা সব শহরের মানুষ
ফেরীঅলার মতো সকাল-সন্ধ্যা ঘামের স্রোতে স্নান
আর সূর্যের যে চকচকে ঝরণা এখন বোশেখের ছাতে
তাতে জগতের গ্রামার যায় বদলে, আর
বোদলেয়ার চলে আসে প্রায়ই উপকথার শাখা-প্রশাখায়
ফরাসী রেস্তোরাঁর স্বাদ তখন নাকের ডগায়...

ওরা কিন্তু মজদুর মানুষ, কালো পেশল বাহু
অবহেলায় ঢেকে রাখে আউলা-ঝাউলা শার্টের হাতায়
তবে বাস্তিল-ফাস্তিল আর কি কি যেন সব
অবসর পেলেই ওরা মনে করিয়ে দেয় রক্তের কথা
যাদের সন্তান সন্ততি হাঁটে, দৌড়ায়
মাংশল পেশীর আড়ালে আবডালে
ওদের প্রতিজ্ঞা ভীষণ
সময় সুযোগ পেলেই পেতলের হাতুড়ি দিয়ে গুড়িয়ে দেবে
সবুজ ক্যালেন্ডার আর মিটমিটে রেডিয়াম

তো সাবধানে চলাফেরা করতে হয় আজকাল
দিনকাল যে তেমন সুবিধার না
সেতো আকাশে তাকালেই বোঝা যায়
প্রায়ই হলুদ রক্ত ঝরে মেঘের মশক থেকে
আর এতযে বাদ্য-বাজনা, সিম্ফনি, রিদম
সুরের পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে কোরাস দৌড়ঝাঁপ
গীটারের পঞ্চম কর্ড তবু স্যাঁতসেঁতে রয়ে যায় ভীষণ রকম

দায়টা শেষমেষ তোমাদের ঘাড়েই
হে সবুজ ক্যালেন্ডার আর বিদঘুটে ডিজিটাল টিকটিক
এমনিতেই সহস্র বিভাজন চারিদিকে
তবু এক খ্যাপাটে বেকুবের মতো উন্মত্ত অধ্যবসায়,
ধারাল অস্ত্রোপচারে টুকরো করে চলেছো
দিন-মাস-ঘন্টা-মিনিট, প্রতিনিয়ত, অবিরাম...

কতিপয় ডায়েরীর কাতিব

রাত্তির কখনো নির্জন পাহাড়ী ঝর্ণার মতো
চেতনার পাষাণ পাথরে স্যাঁতসেঁতে শেওলার জনক
আর কষ্টেরা চকচকে লাল প্রায়শই
বিকেল-আলোর অল্প আঁচে অযুত জঙলায়
জেগে থাকা উদ্ধত বেদানার লজ্জারাঙা গহীন বরণ

আমাদের এই শহর এখন জ্বলছে-নিভছে নিশিদিন
তবু পুরনো ঐকিক নিয়মে খুঁড়িয়ে পথ চলা খামাখাই
আর খুঁটে খাওয়া নতুন বারুদের খুদ, জীবাণু অশেষ
কিংবা গণতান্ত্রিক এক গ্লাস হলুদ জুসেই
কয়েক বছর নিশ্ছিদ্র ঘুম আর মহৎ রক্তপাত অজস্র

তুমি তো দেখবেনা এক ফোঁটাও
কখনো লাগাম ফসকে শিলাবৃষ্টির মতো অহী নাযিল হলে
আমাদের পদবী হয় ডায়েরীর কাতিব
আর আমরা খোদাই করতে বসি দুর্গন্ধ বাতাস
অথচ মেঘেরও অধিক নিকষ কালো ছায়া এঁকে
প্রাগৈতিহাসিতক ঘ্রাণের মাদকতায় উড়ে বেড়ায়
ময়লা দাঁতের রাজা-উজির আর ওমরাহ শত শত

আমরা বিপন্ন বোধ করবো- ভাবি সবসময়
শনিবার সকালে কিংবা বৃহস্পতির নরম সন্ধ্যায়
এমনকি বসন্তের খুব একাকি কোন
ঘোর লাগা নির্দোষ নক্ষত্ররাতেও..

অস্তিত্বের তুমুল আকাশ

কখনো অস্তিত্ব আমার উথলে পড়ে
প্রহর আর প্রস্থানের পিছু পিছু
কখনো আমিত্বের ত্বক আর মাংসপিন্ড
যাতনার বিষবাষ্পে ভস্ম হয়
অসার কঙ্কাল হয়ে হাঁটি আমি
এক মৃতপ্রায় চৈত্রের নরম হাত ধরে
বধ্য-দুপুর কিংবা প্রবাহমান নক্ষত্ররাতে

আলো-ছায়ার সিগন্যালে ক্যালেন্ডার নাচে, সময় নয়
পৃথিবীর সমস্ত দগ্ধ আকাশ বুকপকেটে ফেলে
চকচকে বর্শার ইশারায় ছুটে চলে সে
অশরীরি রানারের মতো

সভ্যতার সতের হাজার চোরাগলিতে দাঁড়িয়ে
অস্তিত্বকে জানতে চেয়েছি আমি
বুঝতে চেয়েছি সময়ের রঙ আর উষ্ণতা
কোথায় আকাশ আর শূন্যতার নিবিড় আলিঙ্গনে
অসার হয়ে থমকে দাঁড়াবে সময়?
অবহেলায় খসে পড়া আপন অস্তিত্বগুলোকে
ঝরে পড়া বোশেখী আমের মতো
কাড়াকাড়ি কুড়িয়ে পাবো কোথায় আবার?

সভ্যতার চোরাগলি কথা বলেনি
আর বধ্যভূমিগুলোর আড়াল থেকে উঠে আসা
সাদাকালো চেহারাগুলো
আমার অর্বাচিন প্রশ্নমালাকে চাবুকে রক্তাক্ত করে
আত্মমগ্ন হারিয়ে গেছে অকস্মাৎ
ইতিহাসের ধুলো জমা পাতায় পাতায়...

মধ্যবর্তী রাতের চাতাল

রাতের চাতাল ভাঙছে চতুর্দিকে
আর অস্থিরতারা ভাসছে বাতাসে
ফেটে যাওয়া শিমুল-দানার মতো
উড়বার সাধ তাদের
উড়বার সাধ ইট-সুড়কির,
দুর্নীতির নির্যাসে পুষ্ট ব্যাঙাচিদের
আর দুর্লঙ্ঘ ফটকের ছায়ায়
জেগে থাকা প্রহরীদের
যাদের বুটের চকচকে বাঁকে
প্রতিদিন চেহারা দেখে ভোরের সূর্য

রাতের চাতাল ফাটছে চারদিকে
নিষিদ্ধ বেলুনের মতো,
পাথরের আঘাতে ছিন্নভিন্ন মস্তক
আর ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদী তরলের মতো
রাতের চাতাল ফাটছে আর
ষড়যন্ত্রেরা কাঁপছে সতর্ক পুষ্টিতে
বড় বড় সড়কে, দালানে
বড় বড় মগজের ঘুলঘুলিহীন কোটরে

কাল নিশ্চিত সূর্য উঠবে জেনেও
কারো কারো ঘুমের জাজিমে জমছে ঘাম
আর চোখের লেন্সগুলোতে সিলিংয়ের গান
অবিরাম ঘুর্ণিপাকে প্রতিনিয়ত গড়ে চলেছে
কুরোসাওয়ার সাদাকালো স্বপ্নমালা...

আগুনের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা

এইতো হামাগুড়ি দেয়া ভোরের সড়ক
দুপুরের ছায়াঢাকা মর্গ আর
ক্রুদ্ধ সন্ধ্যার ছিঁড়ে নেয়া ছিটমহল
তীক্ষ্ণ ছোবলে নির্দয় প্রহর
ক্রমাগত চষছে আমার বুক
আর মধ্যাহ্ন চৈত্রের বহ্নিশিখা
এফোড় ওফোড় করে
শুষে নেয় নদী-নালা
চুমুকে নিঃশেষ করে
অলিন্দে বয়ে চলা উষ্ণ প্রস্রবণ

কুড়ানো রণ'পার প্রতিটি ল্যান্ডমার্কে
পৌঁছি আমি ভেজা ভেজা ধ্বংসস্তুপে
ইতিহাসের কর্কস স্রোত
বয়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে
আর পুরনো অশ্বক্ষুরের ধুম্র মেঘে
পারমানবিক শীতল কোরাস

সতেরো হাজার জিজ্ঞাসার সশস্ত্র প্রহরায়
আমার উড়াল এখন অজানায়
প্রতিটি স্টেশন এখন ব্যাবিলন
আর লাল চাবুক হাতে
অনাগত যুবাদের সামরিক অভ্যর্থনা

লাল কাগজে সত্যি দরখাস্থ করেছি আমি
নক্ষত্রের আগুন থেকে এবেলা
দু'ফোটা বৃষ্টি হোক...

Wednesday, July 18, 2007

উড়ে গেলো চৈত্র-বলাকা

ইতিহাসের কালো পাতাগুলো
পাক খেয়ে শহর শিয়রে
উড়ে গেলো উত্তর আকাশে, আরো একবার
আমরা লাল সূর্যটা বুকে মেখে
মিছিলে কুজনে একাকার,
শুধু দুঃখবিলাসে নিদারুণ ফেটে গেল
আরো এক দুর্লভ পুরনো প্রহর

অযুত চঞ্চল সম্মতিতে
আমরা বেছে নিলাম
রংচঙে উৎসব আর
নৃত্যগীতের গৌণ আকাশ।
হাঁটুজল আবেগের স্রোত
ভুলভাল টি-শার্ট আর
মিগের বেকুব আওয়াজ হয়ে
চৈত্রের বধির এক মধ্যাহ্নকে
দারুণ চপেটাঘাত করে
মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে..

আমরা পড়ে রইলাম
পুরনো সেই সড়কের ধারে
সিকি শতাব্দির ক্ষুধা
আর বস্ত্রহীন অপুষ্ট শরীর নিয়ে,
অনিয়ম পুঁজের নর্দমায়...

বিতর্কের নোনতা ফেনায়
ঢেকে গেলে ঠান্ডা বিকেল
দিনের সমস্ত কোরাস গুটিয়ে-
স্বাধীনতার নরম রং ডানায় মেখে-
পশ্চিম-লালিমায় অলক্ষ্যে উড়ে গেল
পুরনো সেই সান্ধ্য-বলাকা...

Tuesday, March 20, 2007

এক্সপায়ার্ড আত্মকথন

তুমি তো আসলে তাÿই
যা তুমি রচেছো নিগূঢ়ভাবে
কলমের ক্ষিপ্রতায় গেঁথে নেয়া সতেরশÿ মুখর বর্ষা-সন্ধ্যায়
তোমার বেদুইন চপ্পলেরা সস্তা ছন্দে মেতে
তোমাকে বইয়ে নিয়েছে যে বিস্ফারিত রঙ্গশালায়,
যে উচ্ছৃষ্ট তুমি অনর্গল ঠুকরে খেয়েছো এখানে সেখানে
ম্যাকডোনালস কিংবা সামরিক সাইরেনে ন্যুব্জ ফুটপাতে
তুমি তো আসলে তাÿই, নাকি?

তোমাকে তবে মসৃণ মহাসড়ক ছেড়ে
ক্ষুধার্ত হারগিলের মতো অসম দীর্ঘাঙ্গি হতে হবে কেন?
অন্ধ-বণিকের মতো অনর্থক হাতড়ে হাতড়ে হাঁপিয়ে উঠে
কেন তোমাকে পেরোতে হবে মলিন পুরনো অবয়ব?
কেন সুস্বাদু রাইফেলে ঘেরা ছমছম সীমান্তের মতো
গোপন সচেষ্ট প্রয়াসে পেরিয়ে যেতে হবে
সময়ের রক্তলাল কাঁটাতার?

আমরা কেন ভীষণ মগ্নতায় স্পৃষ্ট হয়ে
এক্সপায়ার্ড কদমের মতো
অবিরাম ঝুলতে পারছিনা বর্ষার শীতল আশ্রয়ে?
পরিত্যাক্ত, একাকি আর হয়তো বিমর্ষ দারুণ
তবু মন্দ কি! আপন আলয়ে ভীষণ জমাট হয়ে
এক নাতিক্ষুদ্র জনমের মতো
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মিকেল্যাঞ্জেলো হয়ে থাকা!